Anu Golpo

Recent

লাভস্‌ লেবার লস্ট - 2

1:42 PM 0
রাজা ফার্দিনান্ড শুনলেন ফরাসি রাজকুমারী তীর সাথে দেখা করতে চান। সে কথায় ফার্দিনান্ড
নিজেই এলেন রাজকুমারীর সাথে দেখা করতে। রাজার ব্রত ঘাতে ভঙ্গ না হয় সেজন্য রাজকুমারী
আর তীর তিন সহচরী আগেভাগেই নিজেদের মুখে মুখোশ এঁটে নিলেন যাতে তাদের নারী বলে
(বোঝা নাযায়।

ফরাসি রাজকুমারীকে অভিবাদন জানিয়ে রাজা ফার্দিনান্ড এসে বসলেন তার মুখোমুখি । তাকে
পাল্টা অভিবাদন জানিয়ে রাজকুমারী শুরু করলেন কাজের কথা । ফরাসি রাজকুমারীকে আাকুইতেন
প্রদেশ ফিরিয়ে দেওয়া সম্পর্কে প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা বলে বিদায় নিলেন রাজা ফার্দিনান্ড। এবার
এগিয়ে এসে রাজকুমারীর সহচরী রোজালিন আর ক্যাথারিনের সাথে যেচে আলাপ করলেন
রাজা ফার্দিনান্ডের অন্যতম বন্ধু লর্ড বিরাউন। তিনি চলে যাবার পর রাজকুমারীর আর এক
সহচরী মারিয়া তাকে উল্লেখ করলেন বিকারপ্রস্ত বলে।

একদিন ফরাসি রাজকুমারী তার তিন সহচরীর সাথে শিকারে বেরিয়েছেন, এমন সময় লর্ড
বিরাউনের বিদৃষক বস্টার্ড এসে তার হাতে একটি চিঠি দিয়ে বলল তার প্রভু এই চিঠিটা রোজালিনকে
দেবার জন্য পাঠিয়েছেন, মুখ আঁটা খামটা রাজকুমারী তার হাত থেকে নিলেন । খামটা খুলে চিঠি
পড়ে দেখলেন রাজকুমারী । সেটা একটা প্রেমপত্র-- জনৈক ডন আড্রিয়ানা আর্মাডো একটা প্রেমপত্র
লিখেছে জ্যাকুইনেতা নামে এক গ্রাম্য বালিকাকে। প্রেমপত্র পড়ে তার ভাষায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন
রাজকুমারী । তিনি আবেগের সাথে সেটায় চুমো দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে তিনি চিঠিটা ফিরিয়ে
দিলেন রোজালিনকে।

এদিকে তিন বন্ধুর কারও জানতে বাকি নেই ফরাসি রাজকন্যার প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছেন
রাজা ফার্দিনান্ড। একইভাবে তারাও অস্থির হয়ে উঠেছেন রাজকুমারীর তিন সহচরীকে প্রেম
নিবেদন করার জন্য। হাতে লেখা চিঠি নিয়ে তারা হন্যে হয়ে বনের মাঝে খুঁজে বেড়াচ্ছেন
প্রেয়সীদের। একসময় তারা নিজেরাই ধরা পড়ে গেলেন ফার্দিনান্ডের হাতে। তারা তিনজনেই যে
প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছেন সে কথা স্বীকার করলেন তারা । সেই সাথে তিন লর্ড এও স্বীকার করলেন
যে নারীর মুখ না দেখা, সপ্তাহে একদিন উপোস করা এসব উদ্ভুট বিধি-নিষেধ আরোপ করে তারা
প্রতারণা করেছেন যৌবনের সাথে । তাদের সাথে রাজাও একবাক্যে স্বীকার করলেন নারীই পুরুষের
প্রেরণাদাত্রী, নারীই এনে দেয় পুরুষের পৌরুষত্ব। এবার ফরাসি রাজকুমারী ও তার তিন সহচরীর
মন জয় করতে তাদের রাশি রাশি দামি উপহার পাঠাতে লাগলেন ফার্দিনান্ড ও তার তিন লর্ড
কিন্ত রাজকুমারী ও তার তিন সহচরী একে নিছক মজা বলেই ধরে নিলেন। অনন্যোপায় হয়ে
রাজা ফার্দিনান্ড ও তার তিন লর্ড সরাসরি প্রেম নিবেদন করে বসলেন ফরাসি রাজকুমারী ও তার
তিন সহচরীকে। রাজকুমারী বললেন, নিজের শপথ ভেঙে রাজা যে অন্যায় করেছেন সে জন্য
তিনি তার প্রতি বিশ্বাস হারিয়েছেন। তিনি ফার্দিনান্ডকে বললেন বনে গিয়ে একটানা বারো মাস
কঠোর তপস্যা করতে। বারো মাস তপস্বী জীবন যাপন করার পরও যদি তার প্রেমের অনুভূতি
বজায় থাকে, তাহলে তিনি যেন ফিরে এসে তাকে নতৃনভাবে প্রেম নিবেদন করেন। রাজকুমারী
কথা দিলেন তখন তিনি তার ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে গ্রহণ করবেণ। রাজকুমারী আরও বললেন
ইতিমধ্যে তার বাবা মারা গিয়েছেন। এই বারোমাস তিনি এক নির্জন ঘরে নিজেকে আটকিয়ে
রেখে পিতৃশোক পালন করবেন।
Read More

লাভস্‌ লেবার লস্ট - 1

1:40 PM 0
ফার্দিনান্ড ছিলেন নাভারের রাজা । তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ তিন বন্ধু লর্ড বিরাউন, লর্ড লঙ্গাভিল
আর লর্ড ডুমেন-__এরা সবাই অবিবাহিত।

তিন বন্ধুর সাথে একদিন বিকেলে বেড়ানোর সময় তাদের উদ্দেশ্য করে রাজা ফার্দিনান্ড
বললেন, দ্যাখ মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। মানুষ চায় এ জীবনে বেঁচে থাকার সময় সে যা সাহস
আর বীরত্ব দেখিয়েছে, মৃত্যুর পরও যেন সবাই তা মনে রাখে। তোমরা সবাই আমার কাছে
লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছ যে তিনবছর আমার কাছে থেকে বিধিনিষেধ মেনে বিদ্যার্জন করবে।
আর যে ওসব বিধি-নিষেধ ভাঙবে, তাকে নিজের সম্মান নিজেই বিসর্জন দিতে হবে।,

হেসে লঙ্গাভিল বলল, “আমি আমার সংকল্পে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আর মোটে তো তিনটে বছর।
লিখিত শর্ত অনুযায়ী বললে হয়তো আমার দৈহিক পরিশ্রম বাড়বে, তবুও শান্তিতে থাকতে পারব
আমি।

ডুমেন ছিল একজন দার্শনিক। সে বলল সারাজীবন দর্শনের চর্চা করেই কাটিয়ে দেবে।
অনায়াসেই সে তিনবছর কাটিয়ে. দিতে পারবে।

বিরাউন বলল, রাজার দেওয়া শর্তগুলোর সাথে সে আরও কিছু যোগ করতে চায়। সেগুলি
হল, এই তিন বছর সময়ের মাঝে কেউ নারীর মুখ দেখবে না, দিনে-রাতে এক বারের বেশি কেউ
আহার করবে না আর সপ্তাহে অন্তত একদিন উপোস করবে । তিনঘণ্টার বেশি ঘুমনো চলবে না।
রাতে আর দিনের বেলা বিশ্রামের নামে ঘুমনোও চলবে না। রাজা ফার্দিনান্ড সানন্দে মেনে নিলেন
এই শর্তগুলি।

কথা বলছিলেন রাজকুমারীর সাথে। সে সময় রাজকুমারীর তিন সহচরী রোজালিন, মারিয়া আর
ক্যাথারিনও ছিল সেখানে ।

লর্ড বয়েত বললেন, “মাননীয়া রাজকুমারী! আপনি.মনে রাখবেন নাভারের রাজার সাথে
আযাকুইতেন হস্তান্তর সম্পর্কিত জরুরি কথাবার্তা বলতেই আপনি এখানে এসেছেন।”

রাজকুমারী বললেন, “আপনি হয়তো জানেন না লর্ড বয়েত, আগামী তিনবছর রাজা ফার্দিনান্ড
শুধু লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। এ সময়ে তিনি কোনও নারীর মুখদর্শন করবেন না। আমি
আপনাকে অনুরোধ করছি এ বিষয়ে তার মতামতটুকু জেনে নেবেন। আচ্ছা আপনি বলতে
পারেন এসব আইন কাদের তৈরি % জানতে চাইলেন রাজকুমারী |

“ওই যে নাভারের তিন লর্ড! বললেন বয়েত, 'লঙ্গাভিল, ডুমেন আর বিরাউন -- ওরাই
এসব বিধি-নিষেধের সৃষ্টি করেছেন। আর রাজা ফার্দিনাণ্ড কোনও আপত্তি না জানিয়ে মেনে
নিয়েছেন সে সব।'
Read More

ঈদ কুরবান

4:52 AM 0
Eid Qurban
আসগর সাহেব বারান্দায় বসে আছেন তার প্রিয় বেলিফুল গাছটার পাশে। গাছটা তার স্ত্রী এনেছিল তা বেশ ক'বছর আগে। বেলিফুলের প্রতি রেণু বেগমের অত্যাধিক অবসেশন ছিল। মৃত্যুশয্যায় স্বামীকে বলেছিলেন, "দু'টো ফুল এনে দাও না। একটু গন্ধ নেই। কর্পুরের কড়া গন্ধ পাচ্ছি, বড্ড খারাপ লাগছে।" কর্পুরের গন্ধ আসগর সাহেব পাননি। আজরাইল আলাইহিসসালাম কর্পুর গায়ে মাখেন কিনা তা আসগর সাহেবের জানা নাই। তবে কর্পুর যে জান্নাতি জিনিস তা তিনি যানেন। বেলিফুল গাছে তখন ফুল ছিল না। টবের পাশে গন্ধহীন বাসি কিছু ফুল পরে ছিল। রেণুর বেলি ফুলের গন্ধ আর নেয়া হয়নি। কর্পুরের গন্ধই তাকে নিয়ে গেছে পরপারে।
রহমতের মা ডাক দিল, "চাচামিয়া, হাগাখানায় গরম পানি দিয়াছি। গোসল কইর‍্যা ন্যান।" রহমতের মা'কে হাজারবার বলেও কোন লাভ হয়নি। গোসলখানাকে সে বলে হাগাখানা। তার যুক্তি, যে গোসলখানায় ল্যাপ্টিন (ল্যাট্রিন) আছে সেটা আবার গোসলখানা হয় কীভাবে! ওটা নিঃসন্দেহে হাগাখানা। গোসলখানায় গিজার থাকলেও আসগর সাহেবের পছন্দ সনাতন গরমপানি। মরে গেলে কেউওতো আর গিজারের পানি দিয়ে গোসল করাবে না! তাই চুলার গরম পানি দিয়ে অভ্যস্ত হওয়ার প্রচেষ্টা। ঢাকায় বড়ইপাতার বড্ড অভাব, না হয় গরম পানির সাথে নিশ্চয়ই তিনি বড়ইপাতা মেশাতেন।
পাশের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে 'ঈদ মোবারক' রব। মসজিদের শহর ঢাকায় এক মসজিদের মাইকের কারণে অন্য মসজিদের কথা কিছুই শোনা যায় না। পাশের মসজিদে ঈদের জামাত ৭:৩০ না ৮:০০ টায় তা বোঝা যাচ্ছে না। আসগর সাহেবের এখন গোসল করতে ইচ্ছা করছে না। আলসেমি ভর করেছে তার উপর। ঘুমের অভাব হতে পারে আলসেমির কারণ। আজকাল তার ঘুমে বেশ সমস্যা হচ্ছে। সেহরি খাওয়ার পরে আর ঘুম হতো না ইদানিং। কোথায় যেন সে পড়েছিল সফল ব্যাক্তিরা দিনে ৩-৪ ঘন্টার বেশি ঘুমাননা। আচ্ছা এই ৩-৪ ঘন্টা কি শুধু দিনের ১২ ঘন্টার মধ্যে; যেমন ভাতঘুমের সময়। নাকি পুরো ২৪ ঘন্টায় ৩-৪ ঘন্টা। অনেকটা ডায়াবেটিস রোগীর রুটি খাওয়া গল্পের মতো প্রশ্ন, রুটি, খাওয়ার আগে খাবে নাকি পরে। আসগর সাহেব মনে মনে হাসলেন।
আজকাল মনে মনেই বেশি কথা বলেন তিনি। বড় মেয়ে রুনুর বিয়ে হয়েছে বছর পাঁচেক হল। স্বামী সংসার নিয়ে দিব্যি ব্যাস্ত সে। অস্ট্রেলিয়া থেকে মাঝে মাঝে ভিডিও কলে কথা হয়। দু'বছরের নাতনি নানা বলতে পারে না। ডাকে দা-দা-দা-দা, বড় মধুর সে স্বর। রুনুও কি একইভাবে ডাকত আসগর সাহেবের বাবাকে! আজ আর সেসব কমই মনে পরে। আলঝেইমার জেঁকে বসেছে কিনা কে জানে! ছোট ছেলেটা জার্মানি গিয়েছে পিএইচডি করতে মাস ছয় হলো। বড় মেধাবী ছেলেটাকে ইচ্ছা থাকলেও আটকে রাখতে পারেন নি তিনি। ৪ বেডের এই বাসাতে আসগর সাহেবের এখন একা বসবাস। অথচ কয়েকবছর আগেও কোলাহলপূর্ন ছিল বাসাটা। রুনু আর বেণুর ঝগড়া লেগে থাকত সারাক্ষণ। রুনু, বেণুকে ক্ষেপাত 'হাফ-লেডিস' বলে। সাধারণত ছেলেদের নাম বেণু হয় না। তাদের মায়ের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখতে গিয়ে আশফাক আলি মাতুব্বরের ডাকনাম হয়ে গেছে বেণু। দু'ভাইবোনের মারামারি এখন বড় মিস করেন আসগর সাহেব।
পাশের মসজিদে ঈদের খুৎবা শুরু হয়ে গেছে। আসগর সাহেবের ইচ্ছা হচ্ছে রুনু-বেণুর সাথে কথা বলতে। আগের মত একেক সালামে ১০ টাকা করে সালামি দিতে। ইচ্ছা হচ্ছে বরাবরের মত বাপ-বেটায় একসাথে জামাতে যেতে। সে উপায় আর কই। রুনু নিশ্চয়ই কাজে ব্যাস্ত আছে, ঈদের দিনে কাজের অভাব নেই। বেণুটা ঘুমাচ্ছে। দুপুরে ফোন দেয়া যেতে পারে। এমন সময় তার মনে পরল বেশ কয়েকবছর আগের কথা। এমনি করে হয়তো তাকে সেদিন 'মিস' করেছিল দুই প্রৌঢ়। তখন ঢাকাসহ সারাদেশ লকডাউনে ছিল। ভাইরাস সংক্রমণের আশংকায় বিশ্ব তখন অস্থির। আবেগকে পাত্তা না দিয়ে বাস্তবতার নিরিখে সেবার তিনি গ্রামে ঈদ করতে যাননি। একমাত্র পুত্রকে অন্তত ঈদের দিনে তাদের পাশে আশা করেছিলেন আসগর সাহেবের বাবা-মা। বাবা-মাকে কষ্ট দিতে চাননি তিনি, আবার এটাও চাননি যাত্রাপথে ভাইরাস বয়ে নিয়ে বাবা-মাকে আক্রান্ত করতে। তাই থেকে গিয়েছিলেন মৃত্যুপুরিতে। সেদিন তার বাবা-মাও নিশ্চয়ই চোখের পানি ফেলেছিলেন, তিনি নিজেও কি কম কষ্ট পেয়েছিলেন! বাবা-মা ছাড়া প্রথম ঈদ কাটানো কি খুব সহজ ছিল! 
মসজিদে নামাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। ঈদের নামাজ মসজিদে আদায় করা যায় কিনা তা জানা নাই। ময়লা-ড্রেনের ঢাকায় খোলা ময়দান আর কোথায়! পাঞ্জেগানা নামাজও যেথায় ঈদের নামাজও সেথায়। আসগর সাহেব এখনো বারান্দায় বসে আছেন। রহমতের মা চলে গেছে। সেমাই-ফিরনি আর দুপুরের খাবার রেঁধে দিয়ে গেছে। রহমতের মায়ের হাতে আসলেই রহমত আছে। তার হাতের ফিরনি যেন বেহেশত থেকে আগত। গত ঈদে বেণু টানা একসপ্তাহ এই ফিরনিই খেয়েছে। বেণুটাকে ফিরনি রাঁধা শিখাতে পারলে ভালো হত। পরদেশে আজও হয়তো স্টারবাকসেই মিষ্টির স্বাদ নেবে।
ঈদের নামাজ শেষ হয়েছে। সবাই বাসায় ফিরে যাচ্ছে। যাত্রাপথে ফকিরদের যে যা পারে দান করে যাচ্ছে। রাস্তার অপরপাশে গলির মুখে টং দোকানও খুলেছে। যুবকদের ভীড় লেগেছে সেখানে। একমাস পরে সকালবেলার অতৃপ্ত তৃষ্ণা মিটাচ্ছে প্রাণভরে। টং দোকানের মালকিন তার ছোট্ট মেয়েটাকে সাজিয়ে নিয়ে এসেছে। অন্যদিন বাচ্চাটাকে দোকানে নিয়ে আসতে দেখা যায় না। আজ ঈদের দিন বলেই হয়তো বাচ্চাকে দৃষ্টিহারা করতে চায় না সে। ফকিরের দল চলে গিয়েছে নিজ বাড়িতে, ছেলে-মেয়ের মুখে দু'টো ভালো খাবার তুলে দিতে- পরম তৃপ্তিতে। রহমতের মা'ও খাবার নিয়ে গেছে ভোলাইয়া বস্তিতে। যেখানে নতুন জামা পরে অপেক্ষা করে আছে তার প্রাণ- রহমত। গিজারযুক্ত গোসলখানায়, গোসলের পানি ঠান্ডা হয়ে গেছে। বাহিরের কোলাহলেও নিস্তব্ধ হয়ে আছে আসগর সাহেবের ৪ বেডের বাসা। চোখ তার ভারী হয়ে আসছে। সে চোখে পানির আভাস, যে পানি কিছুটা গরম, কিছুটা নোনতা। আজ তিনি কাঁদবেন, মন ভরে কাঁদবেন। আচ্ছা কান্না কি কখনো মন ভরে করা যায় নাকি মন খালি করে করতে হয়! সে কথা তার জানা নাই। কিছু কথা জানা যায়না কোনদিন। কিছু কথা জানতে হয় না কোনদিন। যেমনি জানা হয়নি, আজ থেকেই কি শুরু হল আসগর সাহেবের নিঃসঙ্গ ঈদ যাপনের!                                        

Read More

আবুলের ঈদ আনন্দ

4:51 AM 0
Abuler Eid Ananda
আবুলের মন খারাপ। পেটে ভাত নাই তার জন্য না। মন খারাপ কারণ আজ এক মাস হতে চলল সে জুতা চুরি করতে পারে নি। কি এক গযব দিয়েছেন আল্লাহপাক, মানুষজন মসজিদে যেতে পারে না। আর আবুল পারে না জুতা চুরি করতে।

আল্লাহকে আবুল ভয় করে না, তা না। আবুলের মনে হয়, 'মানুষ দুনিয়ায় আইছ খালি পায়ে, আল্লাহর কাছে নামাজেও যাবি খালি পায়ে আবার কবরেও যাবি খালি পায়ে। তাইলে তোর মসজিদের বাইরে জুতা পইর‍্যা ফুটানি দ্যাখান লাগবে ক্যান!' দুনিয়ার বুকে দম্ভ করে চললে নাকি কবরে শাস্তির আশংকা আছে। সেক্ষেত্রে একদিক থেকে আবুল মসজিদগামীদের শুভাকাঙ্ক্ষীই বটে। আবুলের চুরির জুতা চালান করার এক বিশ্বস্ত হকার আছে গুলিস্তানে। তার নাম মজিদ। লোকে তাকে মজিইদ্যা বলে ডাকলেও আবুল তাকে যথেষ্ট সম্মান করে। প্রথম যেদিন আবুল বায়তুল মোকাররম থেকে একজোড়া বাটার নতুন জুতা সরিয়েছিল, সেদিন মজিদ তাকে চুরি করতে দেখে ফেলে। আবুলের পিছনে এসে তাকে খপ করে ধরে ফেলে। গল্পে অনেকে লেখে অতিরিক্ত ভয় পেলে নাকি শিড়দাঁড়া বেয়ে শিতল পানির স্রোত নেমে যায়, তবে আবুল টের পেল তার পেটে মোচড় দিয়ে উঠেছে। পেটের চিন্তা সারাদিন যার মাথায় ঘোরে তার পেট মোচড় দেবে এটাই স্বাভাবিক। মজিদ তাকে হাত ধরে স্টেডিয়ামের গেটে নিয়ে আসল। জিজ্ঞেস করল, এ লাইনে কতদিন। যখন বুঝল এ নতুন মাল, তখন সে আবুলকে নিজের দলে ভিড়িয়ে নিল। এ চত্ত্বরে সিন্ডিকেটের অভাব নেই। ছেলেপুলে যার বেশি তার আয়ও বেশি। এতক্ষণ ভয় পেলেও এক্ষণে আবুল নিশ্চিন্তে মজিদের ছায়াতলে আশ্রয় নিল। আর চোরাই জুতা বিক্রির চিন্তা থেকেও মুক্তি পেল। আবুল তাকে বলল, "ভাইজান, আপনে আমার মা-বাপ। আমারে ধোলাই দিবেন না, পিঠে কিঞ্চিৎ ব্যাথা আছে। আমার জুতা আপনার হাতেই দিব। যদি না দেই তবে আপনার জুতা খাই।" মজিদ বলল, "ভাই বলবি না বাপ বলবি আগে ঠিক কর হারামজাদা। তোরে আমার দোকানে চাকরি দিলাম। তুই হবি আমার কারিগর। আমি তোর মালিক। স্যার বইল্যা ডাকলে জুতসই হইবে।" আজীবন মজিইদ্যা ডাক শুনে অভ্যস্ত মজিদ নিজেও সংশয়ে ছিল আদৌ কেউ তাকে স্যার বলবে কিনা। তাই কথার মাঝখানে স্যার উল্লেখের সময় তার গলা কিছুটা কাঁপছিল।

আবুল বাইতুল মোকাররমের বাইরে শুয়ে আছে আর ভাবছে তার সোনালী অতিতের কথা, যখন দিনে ১০-১২ জোড়া জুতা চুরির রেকর্ডও সে করেছে। এমন সময় এক সাংবাদিক গাড়ি মসজিদের সামনে এসে থামল। আবুলকে উঠিয়ে সাংবাদিক সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার মাস্ক কোথায়?" কি মুসিবত! আগে গ্রামে থাকতে কোন মেয়েকে "কী রে রোজা রাখস নাই ক্যান?" জিজ্ঞেস করে সে ব্যাপক পৈশাচিক আনন্দ পেত। আর ইদানিং সবাই আনন্দ পায় মুখখোলা কাউকে, "মাস্ক পরস নাই ক্যান?" জিজ্ঞেস করে। আবুল মিচকা হাসি দিয়ে বলল, "মাস্ক পইর‍্যা শুইছিলাম, কোন ব্যাক্কলে যেন চুরি কইর‍্যা নিয়া গ্যাছে ষাড়।" আবুল স্যার উচ্চারণ করতে পারে না এটা ঠিক না। ভদ্রগোছের কাউকে অপমান করার যোগ্যতা আল্লাহপাক তাকে দেয় নাই। এইজন্য কাউকে সামনা-সামনি গালি দিতে চাইলে সে ষাড় বলে সম্বোধন করে। এতে যদিও চন্দ্রবিন্দুর অভাব থাকে, তাতে ব্যাকরণ না জানা আবুলের কিছু আসে যায় না। সাংবাদিক ভদ্রলোক ক্যামেরাম্যানকে 'কাট' বলে প্রস্থান করল।

- কিরে আবুইল্যা কথা কিছু শুনছস নাকি?
- কি কথা স্যার?
- তোর কামের দিন আইয়া পরছে।
- বলেন কি স্যার!
- সারাদিন মটকা মাইরা থাকলে হইবে? দেশের খবর কিছুতো রাখস না। ঈদের দিন বায়তুল মোকাররমে জামাত হইবে ৫-৬ টা। প্রত্যেক জামাত দিয়া কম কইর‍্যা হইলেও ৩-৪ জোড়া ঘাই মারবি।
ঈদের জামাতের কথা শুনে আবুলের চোখ চকচক করে উঠল, দু'ফোঁটা পানিও জমলো বোধহয় চোখের কোণে। আনন্দাশ্রু বোধহয় একেই বলে। স্রষ্টার উদ্দেশ্যে শেষ কবে আবুল মসজিদে গেছে তা তার মনে নেই। আজ সে যাবে, অবশ্যই যাবে। জামাত না থাকুক, বারান্দায় বসে সূরা-ক্বেরাত ছাড়াই সে দু'রাকাত নামাজ পরবে; শোকরানা নামাজ। আলস্যের দিন শেষ হয়ে এলো বলে।

Read More

"মনু"র গল্প

4:50 AM 0
বন্ধু আবির, আমাদের মেসেঞ্জার গ্রুপে একটি ইউটিউব ভিডিওর লিংক দিয়েছে, সাথে ৫টি হাসির ইমোটিকন। লিংকের নিচে ফরিদ আর নিলয় আমাকে মেনশন করে ভিডিওটি দেখতে বলেছে। খুব আগ্রহ নিয়ে ভিডিওটি চালু করলাম। এক ভদ্রলোক কবিতা পাঠ করছেন, "ও'রে আবুইল্যা, আইজগো তোরে কাঁচা খামু গিইল্যা"। কবিতায় অকারণ কোন গুরুগম্ভীর ভাব  নেই, অন্তর্নিহিত কোন অর্থও হয়তো নেই। খুবই সহজ-সরল ভাষায় চিরকালীন এক ঘটনার বর্ণনা রয়েছে তা'তে। ওদের হাসির কারণ যে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষার বর্ণনা, তা এতক্ষণে বুঝে গেছি।
পরদিন ভার্সিটিতে যাওয়ার পরে, অন্তু ডাক দিয়ে বলল, " কি'রে মনু, ডাইলে লবণ দেছ না দ্যাবা?" আমি মনে মনে হাসি, অবজ্ঞার হাসি, হাসি। আমি জানি আমার অঞ্চলে অন্তত কেউ এরকম জিজ্ঞেস করে না। আমি ঢাকায় এসেই প্রথম এই লাইনটি শুনি। সে যাক গে, আমার এসব গা-সওয়া হয়ে গেছে। ভার্সিটিতে আমার আকিকা দেয়া নাম লাবিব হারিয়ে "মনু" কিংবা "বরিশাইল্যা" হয়ে গেছে সেই কবে! আমি কিন্তু সেটা ভালই উপভোগ করি। আমি, আমার ভাষা, আমার অঞ্চলকে প্রতিনিধিত্ব করি। এতে আমার কোন হীনমন্যতা নেই। প্রমিত বাংলার থেকে বন্ধুমহলে বরিশালের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার আমার পছন্দনীয়। সে জন্য কেউ "বরিশাইল্যা", কেউবা আবার "মনু" বলে সম্বোধন করে। আমি খুশি হই এই ভেবে যে, আমার প্রাণের ভাষায় কথা বলতে পারি।
অনেক বছর আগে, বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছিলাম; মামার বাসায় বেড়াতে। বড়মামা, বাড়িতে আমার চাচার ফোনে কল দিয়ে আমার কানে ধরিয়ে দিলেন। আমি বললাম, "এক মাতারি কইতে আছে, এহন দেওয়া যাইবে না।" মামা, হেসে ফেললেন। বললেন, "মাতারি না, মেয়ে বল।" জীবনে আর কোনদিন "মাতারি" বলেছি কিনা মনে নেই।
উচ্চবিদ্যালয়ে, আমার সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষিকা একদিন হাতে দুটো বেতের বারি দিয়েছিলেন "মুই" বলার কারণে। এখন, "মুই" এর ভিন্নরূপ "মোর", "মোগো" ব্যবহার করলেও "মুই" ব্যবহার করি না বা করা হয় না। আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে "মাতারি" ও "মুই"। এরকম ধীরে ধীরে হয়তো হারিয়ে যাবে অন্যান্য শব্দগুচ্ছ। আঞ্চলিক ভাষা হারিয়ে যাবে প্রমিত বাংলার অন্তরালে, প্রমিত বাংলা হারিয়ে যাবে ইংরেজি কিংবা হিন্দির ছায়ায়। আজ আমরা ক'জন জগা-খিচুরি না পাকিয়ে শুদ্ধভাবে আঞ্চলিক বা প্রমিত বাংলা কিংবা ইংরেজি/হিন্দি বলতে পারি? তারপরও আমরা গর্ব করি ভাষা নিয়ে, ২১শে ফেব্রুয়ারি কিংবা ৮ই ফাল্গুন নিয়ে।      

Read More

লাল-চা কিংবা লাল রং

4:49 AM 0
Red Blood Tea
-   আজাদ সাহেব, আপনার নামের অর্থ জানেন?
-   জ্বি জনাব, বাংলা অ্যাকাডেমি প্রণীত অভিধানের ১৩৪ তম পৃষ্ঠা অনুসারে আজাদ মানে মুক্ত, স্বাধীন, নিষ্কৃতিপ্রাপ্তও বটে। চাইনিজে দুউলি, জনাব আপনি কি চাইনিজ জানেন? 
-   না জানিনা, তবে আপনি চাইলে চাইনিজ আপনার পু*কি দিয়েও বলাতে পারব।
-   সে সুযোগ পাবেন বলে মনে হচ্ছে না। আপনার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। যত দ্রুত সম্ভব বাসায় যান।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচালে থাকা আফজাল সাহেব বাজতে থাকা ফোনটি হাতে নিয়ে দ্রুত প্রস্থান করতে করতে সেন্ট্রিকে বললেন-
-   মালটাকে হাজতে রাখ, আমি আসছি। 
চায়ের নেশা, বড্ড কঠিন নেশা। মাঝরাতে চা খেতে হাফ কিলো রাস্তা হেঁটে বস্তির টং দোকানে এসেছিল আজাদ। বিশুর বস্তি ঘুমায়না কখনো। ভদ্র-অভদ্র হরেক রকম কারবার চলে এখানে। চোখের ইশারায় লেনদেন হয় শ থেকে হাজার টাকার। চায়ের অপেক্ষারত আজাদের উপর পুলিশ অফিসার আফজালের সুদৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হয়। রাত ২ টায় নিশ্চয়ই সুকাজে আসার কথা নয় এখানে, হাজতে নিয়ে দু'চার ঘা দিলে আসল উদ্দেশ্য জানা যাবে।
-   মকবুল সাহেব, এককাপ চা খাওয়াতে পারেন? আমি আবার দুধ চা খাইনা, টি-ব্যাগের চা আনবেন, সাথে একটু লবণ দিবেন। লবণ চা খেয়েছেন কখনো? আপনার জন্যও না হয় এক কাপ নিয়ে আসুন।
-   চা ক্যান, কফি লইয়া আহি! হালা ভোদাই, চা তোর পু*কি দিয়া ভরমু।
-   খারাপ হয় না, জনাব। তাহলে পশ্চাৎদেশ থেকে অনর্গল চাইনিজ বেরোবে, কি বলেন?
-   মষ্করা কর? স্যারের আগে আমিই তোরে বানানি শুরু করমু।
-   রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। আচ্ছা জনাব, পশ্চাৎদেশের প্রতি পুলিশের এত আগ্রহ কেন বলতে পারেন?
-   ডিম ঢুকাইলে পরে বুঝবেন।
হাজতে আজাদের সাথে আরো দুই ব্যাক্তি রয়েছে। যাদের সাথে আজাদের এখনো পরিচয় হয়ে ওঠেনি। একজনের বয়স ২৪-২৫ হবে। রুক্ষ চেহারা, গাল ভিতরে এমনভাবে বসে গেছে যে, নিয়মিত হার্বাল সেবন করে তা অনায়াসে বোঝা যায়। অন্যজনের বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি। এমনভাবে গুটিসুটি মেরে বসে আছে যেন, মাঘের শীতে পর্যদুস্ত। তরুণ ছেলেটি আজাদের উদ্দেশ্যে উপরোক্ত কথাটি বলল।
-   মুখ থাকতে পিছন দিয়ে কি দরকার?    
-   মিয়া ভগর ভগর কম করেন। কি কেস!
-   জানিনা ভাই, ভগ্নিপতি সাহেব জানতে পারেন। মকবুল সাহেব, আমাকে কি চার্জ দেয়া হবে জানেন কিছু?
মকবুল সাহেবের জবাব পাওয়া গেল না, তবে তার নাসিকা-গর্জন জানান দিচ্ছে যে তিনি আছেন।

ঘন্টাদুয়েক পরে, সিগারেট ফুকতে ফুকতে আফজাল সাহেব থানায় ঢুকলেন। পরিক্ষা শুরু হওয়ার মিনিট খানেক আগে সিগারেটের শেষ অর্ধেক যেভাবে টানা হয়, ঠিক সেই ভাবে সিগারেট ফুকছেন তিনি। তার চেহারায় উত্তেজনার ভাব স্পষ্ট।
-   আফজাল সাহেব, মেয়ের নাম কী রাখবেন ঠিক করেছেন?
আজাদের ডাকে আচমকা সম্বিৎ ফিরে পেয়ে আফজাল সাহেব কি একটা অস্ফুট শব্দ করে বসলেন।
-   আমার মনে হয় ভেনাস নামটা বেশি ভাল লাগবে কি বলেন আফজাল সাহেব? আপনার চেহারা মাশাল্লাহ অনেক সুন্দর, আপনার মেয়ে নিশ্চয়ই রুপের দেবী হবে!  
-   হুম। মকবুল, আজাদ সাহেবকে এখানে নিয়ে আস।
আজাদ, আফজাল সাহেবের বিপরীত চেয়ারে বসেছে। সিগারেটের ধোঁয়া তার পিপাসা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
-   তো ছোটখাটো একটা ট্রিট দেন আফজাল সাহেব, আপাতত একটা সিগারেট আর চা দিয়েই শুরু করুন।
-   মকবুল, ২ টা চা নিয়া আস।
-   ধন্যবাদ।
-   তা, আজাদ সাহেব বলুনতো আপনি কিভাবে বুঝলেন আমার স্ত্রী অসুস্থ আর আমার মেয়ে হয়েছে?
-   এ আর এমন কী! শার্লক, ওয়াটসনকে বলেছিলেন, " ইউ সী, বাট ইউ ডু নট অবসার্ভ"। আমি অবসার্ভ করেছি। যেমন আপনার এবং মকবুল সাহেবের নাম জেনেছি নেমপ্লেট দেখে। ঐ যে ছেলেটা, ওর হাতে কাটা দাগ আর গাল ভাঙ্গা, দেখেই বোঝা যায় মাদক মামলায় ওকে আটক করেছে। আবার ঐ মাঝবয়সী লোকটি, দেখুন কেমন জড়সড়ভাবে বসে আছে। ঠিকমত চেহারা দেখা যাচ্ছে না, বার বার মুখ লুকাচ্ছে। মনে হয় এমন কোন অপরাধ করেছে যার জন্য এখন সে লজ্জিত। খুব সম্ভবত ধর্ষণ মামলার আসামী।
-   বাহ! বাহ! তারপর, আমার ব্যাপারটা। তারে আগে চায়ে চুমুক দিয়ে নিন।
দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর কথা আজাদ এতদিন শুনেছে। কিন্তু, আজ লাল চায়ের স্বাদ দুধ চা'য়ে মেটাতে হচ্ছে। সাথে মার্লবোরো, আজাদের পছন্দ ব্ল্যাক।
-   আপনি যখন আমার সাথে কথা বলছিলেন, আপনার নম্বরে হোম লেখা নম্বর থেকে ২টা মেসেজ আসল। আপনি মেসেজ খুলে দেখলেন না, তবে আপনার ভ্রুকুঞ্চন আমার চোখ এড়ায়নি। এরপর একই নম্বর থেকে ফোন আসলে, আপনাকে উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়। হোম মানে বাসা নামে কেবল আপনার স্ত্রীর নম্বরই সেভ করে রাখতে পারেন। রাত আড়াইটায় নিশ্চয়ই সে শুধু শুধু আপনাকে ফোন দিবে না। আপনার বয়স বড়জোর ৩২ হবে। এ মুহূর্তে আপনার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হওয়া অতিমাত্রায় যুক্তিযুক্ত। আপনি বাসায় গিয়ে অল্প সময়ে ফিরে আসলেন, আপনার আচরণে আনন্দ-বেদনা-হতভম্ব অবস্থার মিশ্র রুপ বিদ্যমান। আমরা মুখে যতই বলি, ছেলে-মেয়ে উভয়ই সমান, আদতে প্রথম সন্তান ছেলেসন্তানই কামনা করি। আপনার আচরণ প্রমাণ করে আপনি সে পুত্রসন্তানের দেখা পাননি। 
তাছাড়া, আজ বুধবার, মেয়ের কথা বলে সুন্দর একটা নাম দিতে পারলাম। ছেলে হলে কী দিতাম, বুধাই! হা হা হা।
-   চমৎকার আপনার অবজারভেশন, অসাধারণ আপনার ডিডাকশন। আপনি কিন্তু সহজে মানুষকে ভড়কে দিতে পারেন।
-   আপনাকেও তবে নাড়া দিতে পারলাম নাকি!
-   তা ব'টে। এবার আমি একটু ভড়কে দেবার চেষ্টা করি, কি বলেন!
-   পুলিশ নাম শুনলেই তো জনসাধারণ ভড়কে যায়।
-   আপনি তো আর সাধারণ কেউ না, মিস্টার হোমস। শুনুন, আপনি যে ছেলেটার কথা বলছেন মাদকাসক্ত বলে, ও আসলে খুনের আসামী। প্রেমিকার বিয়ের আসরে আজ প্রেমিকার বাবাকে ছুড়ি মেরেছে। ওর হাতে যে কাটা দাগগুলো দেখেছেন তা বাস্তব জগতের নেশায় বুঁদ হয়ে আঁকেনি। অলীক প্রেমের মোহে আঁচড় কেটেছে। অন্য যে আসামীর কথা বললেন রেপিস্ট হিসেবে, উনি দুর্নীতির আসামী। অফিসের লোকজনই উনাকে ঘুষসমেত ধরে থানায় ফোন দিয়েছে। উনি যদিও বলছেন সব ষড়যন্ত্র। উনার জড়সড় দু'চোখের দিকে ভালোভাবে তাকালে পানির ফোঁটা দেখতে পেতেন।
এবার আসি আমার ব্যাপারে। আইওটি এর নাম বোধকরি শুনে থাকবেন। হোম সিকিউরিটির জন্য ইন্টারনেট অফ থিংস এর ব্যবহার করছি। ট্রাডিশনাল সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করলে আমার সমস্যা হত। আমার বাসার ড্রইং রুমে দেয়ালঘড়িতে, ডাইনিং রুমে ফ্রিজে, এবং বেডরুমে টিভিতে ভয়েস ডিটেকশন সিস্টেম চালু করা রয়েছে। সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে গুগল হোমের মাধ্যমে। আমার বাসায় আমি এবং আমার স্ত্রী থাকতাম। ভয়েস ডিটেকশনে আমাদের দুজনের ভয়েস সেট করা ছিল। আমি গুগল হোম সিস্টেমকে কিছুটা টুইক করে নিয়েছি। এটি সবসময় ভয়েস ডিটেক্ট করতে থাকবে। যদি দেয়ালঘড়ি ও ফ্রিজ অপরিচিত কারো ভয়েস চিহ্নিত করতে পারে, তবে আমাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেসেজ দেবে, আর টিভি ডিটেক্ট করতে পারলে দেবে কল। গুগল হোমের সে ফোন নম্বর আমার ফোনে হোম নামে সেভ করা মিস্টার হোমস।
নিজের উপর বিরক্তি চেপে রেখে আজাদ জিজ্ঞেস করল-
-   তবে, আপনি এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় গিয়েছিলেন আর কেনইবা এত দ্রুত ফিরলেন?
-   এতক্ষণ এত অবসার্ভেশন পাওয়ার দেখিয়ে এতটুকু বিষয় ধরতে পারলেন না মশাই! হোম ২ বার মেসেজ দিয়ে পরে কল করল কেন! আমার বাসায় ড্রইং রুম পেরিয়ে ডাইনিং এবং তারপরে বেডরুমের অবস্থান।
বাসার এক্সট্রা চাবি আমার কাছে আছে। ওরা অতি উত্তেজনায় বোধহয় দরজার ছিটিকিনি লাগাতে ভুলে গিয়েছিল। বাসায় ঢুকে দু'জনকেই পেলাম, আমার বিছানায়, উলঙ্গ অবস্থায়। মাথা কাজ করছিলনা। মাত্র দুটা গুলিতেই দু'জন কুপোকাত। রাগে-ক্ষোভে আরো কয়েকটা বুলেট নস্ট করে এলাম। ধাতস্থ হয়ে ভীত হয়ে গেলাম, দু'টো লাশ, কীভাবে সামলাবো? তার উপর একটা আমার স্ত্রীর! এরপর আচমকা আপনার কথা মনে হল। অকুল দরিয়ায় যেন আশার আলো দেখতে পেলাম।
-   মানে?
-   মানে কিছুনা। চলুন আমার বাসায়। ডাকাত কখনো একজন হয়না, ন্যুনতম ২ জন দরকার। হাজতের বাকি দুজনের নাম খাতায় উঠে গেছে, আপনার থানায় আসার কোন লিখিত দলিল নেই। "ছোটা ডাকাত" হিসেবে আপনাকে মানাবে বেশ।

আজাদকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় আফজাল সাহেবের বাসায়। এরপর আরো দু'টো গুলির শব্দ। আজাদের আর লাল চা খাওয়া হলো না। তার ঠোঁটের কোণায় লেগে আছে গাঢ় লাল রং, যে রং চা'য়ের থেকে অনেকখানি লাল, অনেকখানি গাঢ়।

২দিন পরে; আফজাল সাহেব চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পরছেন। পত্রিকার শেষ পাতায় লেখা রয়েছে, "শহরে চাঞ্চল্যকর ডাকাতি। পুলিশ অফিসার আফজালের বাড়িতে গত বুধবার রাতে সশস্ত্র ডাকাতদল ঢুকে অস্ত্রের মুখে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে। ডাকাতদল পালানোর আগে আফজালের স্ত্রী কৌশলে তাকে ফোন করে। আফজাল ঘটনা আঁচ করতে পেরে সদলবলে তার বাসা ঘেরাও করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাতদল পুলিশের উপর গুলি বর্ষণ করে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে ঘটনাস্থলে আফজালের স্ত্রী মীরা সহ দুই ডাকাত নিহত…"। পত্রিকা রেখে চোখ বুজে আফজাল সাহেব, মকবুলকে চা আনতে পাঠায়, কড়া লিকার দিয়ে দুধ চা। লবণ মিশ্রিত চায়ের প্রতি চুমুকের সাথে একটান ব্ল্যাকের সুমধুর স্বাদ আফজাল সাহেব কখনো পাবে কি!
Read More

প্রেম-প্রতিহিংসা

4:48 AM 0
Broken Glass
: কি ব্যাপার, ফোন ধরতে এত সময় লাগল কেন?
  : এই একটু ওয়াশরুমে ছিলাম।
: এখন কি করছ?
  : এই যে, তোমার সাথে কথা বলছি।
: শব্দ হচ্ছে কিসের? কোন ঝামেলা?
  : না, টিভি দেখছি।
: বাবা-মা বাসায় নেই!
  : না, শপিং এ গেছে।
: আসব নাকি!
  : যাহ দুষ্ট! মাইর দিব… আহ…
: এই কি হল? হ্যালো. হ্যালো..

যাক বাঁচা গেল। মনে ভয়-হিংসা-আনন্দ নিয়ে গাড়ি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছি এই বর্ষার ঢাকায়।

পরেরদিন পত্রিকার তৃতীয় পৃষ্ঠায় তার ছবি দেখলাম। নাহ! ঠিক তার ছবি বললে ভূল হবে। এই ছবি দেখে তার সুন্দর চেহারার কিছুই অনুমান করা সম্ভব নয়। মাথাটা বোধহয় থেঁতলে গেছে, ঝাপসা করে দেয়া। পা একটা হাঁটু থেকে আলাদা হয়ে গেছে। পরনে ছিল গত পরশু আমার দেয়া কামিজ। লাল রঙের জামায় রক্তের কালচে ছাপ স্পষ্ট। এর সাথে থেঁতলানো মাথা দেখলে আরো অপূর্ব লাগতো বোধ হয়। কি হিংস্র হয়ে গেছি আমি! পত্রিকার শিরোনাম “বেপরোয়া গাড়ির শিকার তরুণ-তরুণী”।
তরুণের ছবি দেখতে পেলাম না পত্রিকায়।
“গতকাল বিকেল আনুমানিক ৪:৩০টার দিকে একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় প্রাণ হারায় কলেজ পড়ুয়া ছাত্রী, তার সহযাত্রী তরুণ এবং বহনকারী রিক্সাওয়ালার অবস্থা আশংকাজনক। তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ’তে রাখা হয়েছে। ঢাকা চিড়িয়াখানা রোডে রিক্সায় যাওয়া অবস্থায় পিছনে বাম পাশ থেকে ওভারটেকিং এর সময় গাড়িটি তাদের ধাক্কা দেয় এবং অতিদ্রুত স্থান ত্যাগ করে। এই ঘটনায় মিরপুর শাহ আলি থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে।…”
রিক্সাওয়ালা বেচারার জন্য মায়া লাগছে। কি আর করার; পরিস্থিতির শিকার। আজ কলেজ থেকে নিরাপদ সড়কের জন্য মানববন্ধনের আয়োজন করা হচ্ছে, এখন সেই দিকেই যাচ্ছি।

গতকাল রাতে ঘুম হয়নি। আমি কী করলাম, কী করা উচিৎ ছিল, কী করব এসব নিয়ে ভেবে ভেবেই রাত কেটে গেল। বন্ধু-বান্ধব অনেকে সান্ত্বনা দিয়েছে। করুণ মুখ করে কান্নার অভিনয় করে গেছি।
তার সাথে আমার পরিচয় মাস চারেক আগে, প্রেম ২ মাস হল। বড় ভালবেসেছিলাম! ছিলাম, এখন আর বাসি না। ঘৃণা, শুধু ঘৃণাই তার জন্য।
গতকাল চাচার গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। চিড়িয়াখানার মোড় ঘুরতেই দেখি সে আরেকটি ছেলের হাত ধরে ছাতা মাথায় দিয়ে রিক্সা খুঁজছে। সম্ভবত এই বৃষ্টিতে চিড়িয়া দেখতে এসেছিল! গাড়িটা স্থির করলাম আরেকটু নিশ্চিত হতে। হ্যাঁ, নিশ্চিত হতেই মাথায় রক্ত চড়ে উঠল এবং অতি দ্রুতই পরিকল্পনাটা করে ফেললাম। মাথা যথেষ্ট ঠান্ডা করে সুযোগের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে রইলাম; মাছরাঙা যেমন মাছ শিকারের অপেক্ষায়। সুযোগ বুঝে ফোন দিলাম তাকে। তার মিথ্যা আমাকে আরও উদ্বুদ্ধ করল কাজটা ঘটাতে। সুযোগ বুঝে কাজটা ঘটিয়ে বামে মোড় নিয়ে পগার পার।
ভয় হচ্ছিল যদি ধরা পরে যাই! ঢাকার বৃষ্টি আমায় সাহায্য করল। রাস্তার পানি - বৃষ্টির পানি ধুয়ে দিল গাড়ির রক্তের দাগ। আমি নিশ্চিন্ত হলাম; পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হলাম কি! তার দুর্ঘটনার পূর্বমুহূর্তে আমার ফোন ছিল। ফোন ট্র‍্যাক করলে সহজে যে কেউ বুঝে যাবে তখন ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম এবং গাড়ির স্পিডের সাথে সাথে আমার ফোনও স্থান পরিবর্তন করেছিল। তবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কেউ এত থরো ইনভেস্টিগেশন করবে বলে মনে হয় না। কত স্বপ্নের জাল ছিঁড়ে যায় এই সড়কে, কেইবা তার খবর রাখে!
Read More